
নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেট সদর উপজেলার চেঙ্গেরখাল নদীতে ইউনিয়ন পরিষদ ও মার্কম্যান ট্যাক্সের নামে দীর্ঘদিন ধরে নৌযান থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মামলা হলেও অভিযোগের মূল অভিযুক্ত কবির আহমদ এখনও গ্রেপ্তার না হওয়ায় নৌযান শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে।
সারি-গোয়াইন নদীর চেঙ্গেরখাল অংশ বর্ষা মৌসুমসহ সারা বছর সীমান্তবর্তী ভোলাগঞ্জ, জাফলংসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে উত্তোলিত বালু-পাথর পরিবহনের অন্যতম প্রধান নৌপথ। এই পথ দিয়ে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য পরিচালিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অজুহাতে নৌযান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা মৌসুম এলেই এ চাঁদাবাজি আরও বেড়ে যায়। ভুয়া লিজ, জাল কাগজপত্র এবং ইউনিয়ন ও মার্কম্যান ট্যাক্সের নামে প্রকাশ্যে অর্থ আদায় করা হলেও প্রশাসনিক তৎপরতা দৃশ্যমান নয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এয়ারপোর্ট থানার নোয়াটিলা গ্রামের মৃত সুনু মিয়ার ছেলে কবির আহমদ নিজেকে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের মার্কম্যান পরিচয় দিয়ে কয়েক বছর ধরে এ চক্র পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহ আলম জানিয়েছেন, চেঙ্গেরখাল এলাকায় কবির নামে কোনো মার্কম্যান দায়িত্ব পালন করছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
গত ১৯ জুন বালু-পাথর ব্যবসায়ী আজিজুর রহমান বিলালের অভিযোগের ভিত্তিতে সালুটিকর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালায় ছাতক নৌপুলিশ। এ সময় চাঁদা আদায়ের সময় হাতেনাতে মামুন মিয়াকে আটক করা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা, খাদিমনগর ইউনিয়ন পরিষদ ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের নামে দুটি রশিদ বই, নগদ ২ হাজার ২২০ টাকা এবং তিনটি বাঁশের লাঠি জব্দ করে।
এ ঘটনায় আজিজুর রহমান বিলাল বাদী হয়ে গোয়াইনঘাট থানায় পাঁচজনের নাম উল্লেখসহ আরও ২-৩ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-২১, তারিখ: ১৯ জুন ২০২৬)।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আটক মামুন মিয়া মূল অভিযুক্ত কবির আহমদের ভাই। মামলায় কবির, মামুন ও তাদের আরেক ভাই রুবেলকেও আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা পরস্পরের যোগসাজশে ইউনিয়ন পরিষদ ও মার্কম্যান ট্যাক্সের নামে নৌযান থেকে অর্থ আদায় করতেন। পরে আদালতের মাধ্যমে মামুন মিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, মামলার পর প্রায় এক সপ্তাহ চাঁদা আদায় বন্ধ থাকলেও পরে আবারও তা শুরু হয়। ফলে মামলা হওয়ার পরও মূল অভিযুক্ত গ্রেপ্তার না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নৌযান শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কবির আহমদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি জানেন না বলে ফোন কেটে দেন।
এর আগে ৩ নম্বর খাদিমনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. দিলোয়ার হোসেন জানান, নদীপথে ইউনিয়ন পরিষদের নামে ট্যাক্স আদায়ের জন্য কাউকে লিজ দেওয়া হয়নি। ভুয়া রশিদ ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত রয়েছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছাতক নৌপুলিশের এসআই (নিঃ) জয়ন্ত চন্দ্র দে বলেন, “মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। চাঁদাবাজি বন্ধ এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।”
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক বলেন, “মামলার তদন্ত নৌপুলিশ করছে। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এয়ারপোর্ট থানার ওসি শহিদুর রহমান বলেন, “ইউনিয়ন ট্যাক্সের নামে অর্থ আদায়ের বিষয়টি আগে জানা ছিল না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সিলেট সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরকার মামুনুর রশীদ বলেন, “চেঙ্গেরখাল নদীতে চাঁদাবাজির ঘটনায় মামলা হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রমের ওপর উপজেলা প্রশাসনের নজর রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”