
নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট:: দুদিন ধরে খেতে চাইছিল না ৯ মাসের ছোট্ট ইনায়া জান্নাত। গায়ে জ্বর, মুখে খাবারের রুচি নেই। যে শিশুর হাসি আর কলকাকলিতে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে থাকত আনন্দ, সেই সোনামণির নীরবতা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলনা পরিবার। মা সুমাইয়া সিদ্দিকা তানিয়া মেয়ের চিকিৎসা করাতে মা শাশুড়ীর সঙ্গে বের হয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার পথে অসুস্থ মেয়ের জন্য সঙ্গে নিয়েছিলেন কলাও।
কিন্তু কে জানত, মেয়েকে নিয়ে সেই বাড়ি ফেরাই আর হবে না! পথেই থেমে যাবে মা-মেয়ের জীবনের গল্প। দুই যানবাহনের সংঘর্ষে নিভে গেল একই সঙ্গে দুটি প্রাণ। মায়ের কোলে আর বাড়ি ফেরা হলো না ছোট্ট ইনায়ার।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ মহাসড়কের বুড়িবস্তি এলাকায় বাস ও টমটম অটোরিকশার সংঘর্ষে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থল ও পরবর্তী পরিস্থিতিতে মা-মেয়ে নিহত হন। দুর্ঘটনায় অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। অটো চলক সহ আহত হয়েছেন অন্য আরো ৪ যাত্রী।
নিহতরা হলেন, সিলেটের বিমানবন্দর থানাধীন লালবাগ এলাকার বাসিন্দা ছামী’র স্ত্রী সুমাইয়া সিদ্দিকা তানিয়া এবং তাঁদের ৯ মাস বয়সী শিশুকন্যা ইনায়া জান্নাত। সুমাইয়া পার্শ্ববর্তী এলাকা নাকচাপড়া এলাকার মৃত আতাউর রহমানের মেয়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী জেলা ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদ হোসেন জানান, দুর্ঘটনাটি তাঁর চোখের সামনেই ঘটেছে। তাঁর ভাষ্য, অটোরিকশাটি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ওভারটেক করছিল। একই সময় বিপরীত দিক থেকে আসা বাসটিও সামনে থাকা আরেকটি বাসকে ওভারটেক করার চেষ্টা করছিল। এ সময় দুই যানবাহনের সংঘর্ষ হয়। চোখের সামনেই প্রথমেই ছিটকে পড়ে শিশুটি! দুর্ঘটনার জন্য উভয় পক্ষের চালকেরই সমান দায় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাদা পাথর এক্সপ্রেস যেনো সড়কপথে অঘোষিত এক বিমান। এদের অদক্ষ ও অসতর্ক চালকদের বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের কারণে সড়কে এমন একাদিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এ দুর্ঘটনায় দুজনের প্রাণহানির পাশাপাশি অন্য আরও ২জন আহতদের অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
পুলিশ জানায়, সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ মহাসড়কের বিমানবন্দরের রানওয়েসংলগ্ন এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা ইলেকট্রিক অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয় সাদাপাথর পরিবহনের একটি বাস। বাসটির নম্বর সিলেট-জ ১১-০৫৮৯। ঘটনাস্থল থেকে ঘাতক বাস ও টমটম আটক করা হয়েছে।
সিলেট এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুর রহমান জানান, নিহত মা-মেয়ের মরদেহ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর বাসচালক পালিয়ে গেলেও বাসটি আটক করেছে পুলিশ।
একটি পরিবারের কাছে হয়তো এখন সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা—অসুস্থ মেয়ের জন্য কলা আর ঔষধ হাতে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো আর কোনো দিন ফিরবে না। ছোট্ট ইনায়ার জন্য মায়ের সেই শেষ যত্ন আর সুমাইয়ার ঘরে ফেরার স্বপ্ন থেমে গেল মহাসড়কের এক মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায়। ফুটফুটে বাবুটার ঔষধ কলা আর সাথে তরতাজা রক্ত আবারও ছুটে চলা গাড়ির চাকায় মুছে যাবে।