
সিকারি ডেস্ক:: ওলীকুল শিরোমণি হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি যুগোপযোগী ও যৌক্তিক কাঠামো নির্ধারণ করবে।
শুক্রবার (২৬ জুন) সকালে সিলেট সার্কিট হাউসে হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
গঠিত কমিটির অপর সদস্যরা হলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসক রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের শামীম, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. মো. জিললুর রহমান, মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম, মাজারের মোতয়াল্লি পরিবারের দুই সদস্য, মাজার মাদরাসা ও মসজিদের দুই প্রতিনিধি। এই কমিটির সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন সিলেটের জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) পিংকি সাহা।
সম্প্রতি শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে তালা দেয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়। দীর্ঘ আলোচনা শেষে মাজারের সার্বিক উন্নয়ন এবং দানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ে সবাই একমত হন।
বৈঠক শেষে মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সাংবাদিকদের বলেন, ‘দরগাহর উন্নয়ন, দানের অর্থের ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক কার্যক্রমের একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার বিষয়ে মাজার কর্তৃপক্ষসহ সবাই ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। সবার মতামতের ভিত্তিতেই এই ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা আগামী এক মাসের মধ্যে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে।’
তিনি বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখাই সরকারের মূল লক্ষ্য। তবে নতুন কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আপাতত বিদ্যমান কমিটিই প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দানবাক্সের অর্থ গণনা করবে এবং তা মাজারের চলমান ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে।’
বিদায়ী জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের পূর্ববর্তী উদ্যোগ নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অতীতের কোনো বিষয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি করতে চাই না, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। যেকোনও কাজ এককভাবে করার চেয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে যুক্ত করে করাটা বেশি কার্যকর। সরকার এমন একটি টেকসই উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে কাজের স্বচ্ছতার পাশাপাশি সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং ভবিষ্যতে কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়।’
এর আগে সকালে সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দরগাহর ঐতিহ্য রক্ষা, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে সিলেটের স্থানীয় রাজনীতিবিদ, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও মাজার কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সিসিকের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, বিভাগীয় কমিশনার ড. মোশারফ হোসেন, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. জিল্লুর রহমান, সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী জাবের সাদেক, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী।
উল্লেখ্য,১২ জুন হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান সাবেক ডিসি সারওয়ার আলম। এসময় তিনি মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়ার ঘোষণা দেন। এরই অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মাজারে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি মাজারে মানুষের দানের অর্থ রাখার জন্য থাকা ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেক ও একটি দানবাক্স সিলগালা করা হয়।
এ ঘটনার পর জেলা প্রশাসকের পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। কেউ জেলা প্রশাসকের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেন। আবার প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপনের বিষয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ বিতর্কের মধ্যেই গত রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করে প্রজ্ঞাপন দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ প্রজ্ঞাপনের পর ডিসিকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি করে বিভিন্ন সংগঠন।
ডিসির প্রত্যাহার হওয়ার প্রজ্ঞাপন জারির পরদিন সোমবার সারওয়ার আলম মাজারে যান। দুপুর ২টার দিকে তার নির্দেশনায় দানবাক্স ও সিলগালা করা ডেগগুলো খোলা হয়। টাকা গণনা শেষে সন্ধ্যায় জানানো হয়, আটটি ডেগ ও দানবাক্সে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা নগদ পাওয়া গেছে। এছাড়া ৭ আনা স্বর্ণালংকার ও ১০ সৌদি রিয়াল মিলেছে। এসব টাকা হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের নামে ব্যাংক হিসাবে রাখা হবে।
টাকা গণনা শেষে সোনালী ব্যাংকের কোর্ট বিল্ডিং শাখায় নতুন একটি ব্যাংক হিসাব চালু করে দানের সমুদয় টাকা জমা দেয়া হয়। পাশাপাশি ডিসি সারওয়ার আলম জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে আরও ৫ লাখ টাকা ওই তহবিলে দান হিসেবে জমা দেন। সেদিন রাতে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে পরদিন মঙ্গলবার তিনি সিলেট ছাড়েন।