
নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট: সিলেট সদর উপজেলার ৩ নং খাদিমনগর ইউনিয়নে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়কে কেন্দ্র করে সম্প্রতি সৃষ্টি হওয়া বিতর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের বিরুদ্ধে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে ইউনিয়ন পরিষদের বিরুদ্ধে ওঠা ‘চাঁদাবাজির’ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে খাদিমনগর ইউনিয়ন পরিষদ।
পরিষদের দাবি, হোল্ডিং ট্যাক্স কোনো ব্যক্তিগত চাঁদা বা অবৈধ অর্থ আদায় নয়; বরং প্রচলিত আইন ও সরকারি বিধিমালার আওতায় নির্ধারিত একটি বৈধ কর। সোমবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবাদ বিবৃতিতে খাদিমনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. দিলোয়ার হোসেন এ দাবি করেন।
সম্প্রতি খাদিমনগরে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় ও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে আয়োজিত একটি মানববন্ধনে পরিষদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়। এ অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও কাল্পনিক বলে দাবি করেছেন চেয়ারম্যান মো. দিলোয়ার হোসেন।
তার মতে, আইন ও সরকারি বিধানের আওতায় পরিচালিত একটি কার্যক্রমকে ‘চাঁদাবাজি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার শামিল।
প্রতিবাদ বিবৃতিতে চেয়ারম্যান বলেন, হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় ইউনিয়ন পরিষদের কোনো নতুন বা নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের কর আদায়ের বিধান রয়েছে। শুধু খাদিমনগর নয়, সিলেট সদর উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নেও অনেক আগে থেকেই হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের কার্যক্রম চালু রয়েছে।
কী বলছে আইন?
ইউনিয়ন পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন এবং ‘ইউনিয়ন পরিষদ আদর্শ কর তফসিল, ২০১৩’ অনুযায়ী হোল্ডিং ট্যাক্স ধার্য ও আদায়ের বিধান রয়েছে।
গেজেটের ৩ নং ধারা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের আওতাভুক্ত ইমারত ও ভূমির বার্ষিক মূল্যের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপের সুযোগ রয়েছে।
তবে খাদিমনগর ইউনিয়ন পরিষদের দাবি, তাদের এলাকায় সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ হারের তুলনায় অনেক কম হারে কর নেওয়া হচ্ছে। পরিষদের ভাষ্য অনুযায়ী, খাদিমনগরে হোল্ডিং ট্যাক্সের পরিমাণ ১ শতাংশেরও কম।
চেয়ারম্যান মো. দিলোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি আইন ও বিধিমালার নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যেই খাদিমনগরে হোল্ডিং ট্যাক্স কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন ইউনিয়নে বহু আগে থেকেই হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এমনকি উপজেলার অন্যান্ন ইউনিয়নেও। খাদিমনগর ইউনিয়নে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসেসমেন্টের মাধ্যমে হোল্ডিং ট্যাক্স কার্যক্রম শুরু হয়।
পরিষদের দাবি, কর নির্ধারণ ও আদায়ের পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। এ সংক্রান্ত তথ্য ও কার্যক্রম ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
কেন নেওয়া হচ্ছে হোল্ডিং ট্যাক্স?
ইউনিয়ন পরিষদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থেই সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করা হচ্ছে।
চেয়ারম্যান মো. দিলোয়ার হোসেন বলেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও তাগিদের ভিত্তিতেই কর আদায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তবে তার অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আইনের অপব্যাখ্যা করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
স্বচ্ছতা ও জনআস্থার প্রশ্ন
হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে চলমান বিতর্কে স্থানীয়দের একটি অংশ কর আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে করের হার, এসেসমেন্ট প্রক্রিয়া এবং আদায়কৃত অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় হচ্ছে—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
তবে ইউনিয়ন পরিষদ দাবি করছে, পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে এবং জনগণ চাইলে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করতে পারবেন।
চেয়ারম্যান মো. দিলোয়ার হোসেন ইউনিয়নবাসীকে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে যোগাযোগ করে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
দুই অবস্থানে বিতর্ক
খাদিমনগরে হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে চলমান বিতর্কে এখন দুই ধরনের অবস্থান স্পষ্ট। একদিকে স্থানীয়দের একটি অংশ কর আদায়ের বিরোধিতা করে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলছেন। অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদ বলছে, এটি কোনো চাঁদাবাজি নয়, বরং সম্পূর্ণ আইনসম্মত একটি সরকারি বিধান।
তবে এই বিতর্কের অবসানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে—কর নির্ধারণের পদ্ধতি, করের হার এবং আদায়কৃত অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে জনগণের কাছে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট তথ্য তুলে ধরা।
ইউনিয়ন পরিষদের দাবি অনুযায়ী, হোল্ডিং ট্যাক্স আইন মেনেই আদায় করা হচ্ছে এবং খাদিমনগরে করের হারও নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমার তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে স্থানীয়দের বিভিন্ন প্রশ্ন ও উদ্বেগের যথাযথ জবাব নিশ্চিত করা গেলে হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে চলমান বিভ্রান্তি কাটবে এবং ইউনিয়ন পরিষদের প্রতি জনআস্থাও আরও বাড়বে।