সরকারি তথ্য অনুযায়ী, খাদিমনগর ইউনিয়নের আয়তন প্রায় ৭৮ দশমিক ১৬ বর্গকিলোমিটার। ইউনিয়নে রয়েছে ১০৬টি গ্রাম ও ১২টি মৌজা। এর দক্ষিণ সীমানা সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে যুক্ত। ভৌগোলিক অবস্থান এবং সিটি কর্পোরেশনের কাছাকাছি হওয়ায় খাদিমনগরের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয়দের হিসাবে, এ এলাকায় বড় ও মাঝারি পর্যায়ের প্রায় ১৫টি উল্লেখযোগ্য বাজার ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম রয়েছে।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে খাদিমনগর এলাকার গুরুত্ব বিশেষভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি গ্র্যান্ড সিলেট, উইন্ডসর, পর্যটন মোটেল, বিভিন্ন ক্লাব, রিসোর্ট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় এ অঞ্চল এখন বিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। প্রতিদিন স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিদেশ থেকে আসা মানুষও এসব এলাকায় যাতায়াত করছেন।
এ ছাড়া ধোপাগুল এলাকায় পাথর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। পাথর ব্যবসা, পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসার কারণে এখানে মানুষের চলাচল ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্তমান গতিতে উন্নয়ন ও বসতি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে খাদিমনগরে জনসংখ্যার চাপ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও বেড়ে যাবে। কিন্তু সেই চাপ মোকাবিলায় এখন থেকেই পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে নানা ধরনের নাগরিক সংকট দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। দ্রুত জনবসতি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাড়লেও সেই তুলনায় আধুনিক বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন এলাকায় যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার অভিযোগ রয়েছে। বাজার ও বাণিজ্যিক এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন নিয়ে সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোথাও কোথাও পানিপ্রবাহের খাল ও ছড়া দখল করা হয়েছে, আবার কোথাও পানিপ্রবাহের নালার ওপর বা আশপাশে সড়ক ও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মাণ, অপর্যাপ্ত ড্রেন এবং পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত বা বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, খাদিমনগরের উন্নয়ন এখন পরিকল্পিতভাবে না করলে পরবর্তীতে সিলেট নগরীর আশপাশের অন্যান্য এলাকার মতো এখানেও জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিকল্পিত ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণ জরুরি। একই সঙ্গে এলাকার খাল, ছড়া ও প্রাকৃতিক জলাধারগুলো সংরক্ষণ করতে হবে।
পরিবেশবিদ ও সচেতন মহলের মতে, দ্রুত নগরায়ণ হওয়া এলাকাগুলোতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে জলাভূমি ভরাট, খাল-ছড়া দখল এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। তাই খাদিমনগরের উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, খাদিমনগরকে এখন আর শুধু একটি সাধারণ গ্রামীণ ইউনিয়ন হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সীমানাঘেঁষা এই এলাকা ধীরে ধীরে নগর সম্প্রসারণের অংশ হয়ে উঠছে। তাই ভবিষ্যতের জনসংখ্যা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে এখানকার উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও জনবহুল এলাকায় নির্দিষ্ট বর্জ্য সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। নিয়মিত ময়লা সংগ্রহ ও অপসারণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বড় হোটেল, রিসোর্ট, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে পরিকল্পিত ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণ, বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ রক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। খাল, ছড়া ও জলাধার দখল ও ভরাট বন্ধ করে সেগুলো সংরক্ষণ করা গেলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও অনেকাংশে কার্যকর হবে বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, খাদিমনগরের বর্তমান উন্নয়ন ও সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে এখনই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ জনসংখ্যা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও বাড়ার পর অবকাঠামো উন্নয়ন করতে গেলে ব্যয় ও জটিলতা দুটোই বাড়বে।
তাদের মতে, সময়োপযোগী পরিকল্পনার মাধ্যমে খাদিমনগরে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এলাকাটি সিলেটের একটি পরিকল্পিত আধুনিক জনপদ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
তাই দ্রুত নগরায়ণের বাস্তবতা, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক গুরুত্ব, পর্যটন ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতের জনসংখ্যার চাপকে সামনে রেখে খাদিমনগরের জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার আধুনিকায়নে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে সম্ভাবনাময় এই জনপদকে ভবিষ্যতে নানা সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।