
সিকারি ডেস্ক:: সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে হত্যা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ওপর হামলাসহ একাধিক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা মো. আবুল হাসানের জামিন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তাঁকে আদালত থেকে জামিন করিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সুনামগঞ্জ জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মল্লিক মঈন উদ্দিন সুহেলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিপি।
সোমবার হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল হাসানের জামিনের পর আদালতপাড়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
জুলাই বিপ্লবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যান। এ সময় জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল হাসানও নিজেকে রক্ষার জন্য প্রথমে লন্ডনে পালিয়ে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি ও আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের একাংশের মধ্যে গোপন স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পক্ষে গোপনে লবিং ও আইনি সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে বিএনপিপন্থী কিছু প্রভাবশালী আইনজীবীর বিরুদ্ধে। আদালতপাড়ায় বিষয়টি প্রকাশ্য আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাসানের জামিনের ঘটনায় জেলাজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
আদালতপাড়ার একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, আবুল হাসান লন্ডনে অবস্থানকালে হোয়াটসঅ্যাপ ও ডিজিটাল মাধ্যমে সুনামগঞ্জ জেলা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট মল্লিক মঈন উদ্দিন সুহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে পিপির পরামর্শেই তিনি আকস্মিকভাবে দেশে ফিরে আদালতে হাজির হয়ে জামিন পান বলে সূত্রটি জানিয়েছে। সূত্রের আরও দাবি, পিপি মল্লিক মঈন উদ্দিন আদালতে আবুল হাসানকে অসুস্থ হিসেবে উপস্থাপন করে তাঁর জামিনের ব্যবস্থা করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সৈয়দপুর-শাহারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুল হাসান সৈয়দপুর ইশানকোনার মৃত আব্দুল হকের ছেলে। তিনি ২০২৩ সালে জগন্নাথপুরের সৈয়দপুর গ্রামের আনহাই মিয়ার ছেলে জামাল মিয়া (৪০) হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান পলাতক আসামি। মামলাটির নম্বর জিআর-৫২/২০২৩, জগন্নাথপুর।
এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে জগন্নাথপুর থানায় আরও কয়েকটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মামলাগুলো হলো—
জিআর-১০৪/১২ (জগন্নাথপুর): দণ্ডবিধির ১৪৩/১৪৪/১৪৯/৪৪৭/৩২৩/৩২৪/৩২৬/৩০৭/৪৩৬/৫০৬/১১৪ ধারায় মামলা।
জিআর-১৬৬/১৩ (জগন্নাথপুর): দণ্ডবিধির ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩২৪/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/১০৯ ধারায় মামলা।
জিআর-৬৭/২০১৬ (জগন্নাথপুর): স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০-এর ১(ছ) বিধি এবং দণ্ডবিধির ১৪৭/১৪৮/১৪৯/৩৩২/৩৫৩/৩০৭/৩৭৯ ধারায় মামলা।
জিআর-১২৬/২০ (জগন্নাথপুর): দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩০৭/৩৮০/৪২৭/৫০৬/১০৯ ধারায় মামলা।
পাশাপাশি সিলেটের জালালাবাদ, কোতোয়ালি ও এয়ারপোর্ট থানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় করা একাধিক এজাহারভুক্ত মামলাতেও আবুল হাসানের নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, আর্থিক লাভের আশায় জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর চালানো নির্যাতনের বিষয়গুলো উপেক্ষা করছেন বিএনপিপন্থী কিছু আইনজীবী। রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার অজুহাতে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের আইনি সুরক্ষা দিয়ে অর্থ উপার্জনের অভিযোগও উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বিএনপির নেতারা বিভিন্ন জনসভায় শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে লুটপাট ও অর্থ পাচারের অভিযোগ তুলে বক্তব্য দিলেও সুনামগঞ্জের অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতাদের বিষয়ে তাঁদের অনেকেই নীরব রয়েছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আসামিদের গ্রেপ্তারে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সুনামগঞ্জের কোনো প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাকে আটক করতে গেলে স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতার মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তাঁদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, নিজেদের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং দলীয় স্বার্থ হাসিলের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে জামাল মিয়া হত্যা মামলার বাদীপক্ষের পরিবারের সদস্য নিহতের ছোট ভাই হোসাইন মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আদালতে মানুষ যায় ন্যায়বিচারের বুকভরা আশা নিয়ে। অথচ জামাল হত্যা মামলায় আমাদের পক্ষের কৌশলীকেও আদালতে আসামির হাজিরা কিংবা জামিনের বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়। পিপি অ্যাডভোকেট মল্লিক মঈন উদ্দিন সুহেল ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের কৌশলীকে বিষয়টি জানাননি।”
অন্যদিকে, আবুল হাসানের জামিনের বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ জেলা জজ আদালতের পিপি ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মল্লিক মঈন উদ্দিন সুহেল তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তিনি জানান, জামাল মিয়া হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। তবে আবুল হাসানের বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য মামলার বিষয়ে তিনি জানেন না বলে জানান।