
নিজস্ব প্রতিবেদক,
সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট যেন চোরাচালান সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। স্থানীয় থেকে জাতীয় দৈনিক কিংবা অনলাইন সংবাদমাধ্যমে—প্রতিদিনই উঠে আসছে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য প্রবেশ, পরিবহন ও বিপণনের নানা অভিযোগ। কখনো নির্বিঘ্নে চলছে চোরাচালান আবার কখনো আটক হচ্ছে পণ্যবাহী গাড়ি, কখনো জব্দ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য। মাঝেমধ্যে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কঠোর হুঁশিয়ারি আসলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কতটা পরিবর্তন হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
রাত গভীর হলেই সীমান্ত হতে শহরমুখি সড়কগুলোতে বাড়ে সন্দেহজনক যানবাহনের চলাচল। সড়কের একাদিক স্থানে বসে প্রশাসনের একাধিক বাহিনীর টিম। তবুও অন্ধকারের বুক চিরে চাকার ঘর্ষণে শাঁ শাঁ শব্দ তুলে ছুটে চলে পণ্যবাহী পিকআপ, ট্রাক, প্রাইভেটসহ অন্যান্য যানবাহন। অভিযোগ রয়েছে, এসব যানবাহনের কোনো কোনোটিতে থাকে ভারত থেকে অবৈধ পথে দেশে প্রবেশ করা সবজি, চিনি, জিরা, চকলেট বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য, আর মাদকসহ ইলেকট্রনিক সার্কিটসহ নানা ধরনের পণ্য। সীমান্ত থেকে সড়কপথে এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য রয়েছে সক্রিয় পরিবহন ও বিপণনের একাধিক চক্র।
গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাটের ভৌগোলিক অবস্থান সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালানের ঝুঁকিতে রয়েছে। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পণ্য প্রবেশের অভিযোগ, সড়কপথে পরিবহন এবং স্থানীয় পর্যায়ে মজুত ও বিক্রির ঘটনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।
কোনো ঘটনায় প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হয়, জব্দ করা হয় পণ্য ও যানবাহন। কোথাও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার খবরও আসে। জনপ্রতিনিধিরা চোরাচালান বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
তবে এসব উদ্যোগের পরও যদি একই পথে একই ধরনের পণ্যের অবৈধ পরিবহন অব্যাহত থাকে, তাহলে অভিযান ও হুঁশিয়ারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিচ্ছিন্নভাবে পণ্য জব্দ করাই কি চোরাচালান বন্ধের জন্য যথেষ্ট, নাকি এর পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন—এখন সেই প্রশ্নই সামনে আসছে।
চোরাচালান কেবল সীমান্ত দিয়ে পণ্য প্রবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে পণ্য সংগ্রহ, সীমান্ত পারাপার, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, পাইকারি সরবরাহ ও খুচরা বাজারে বিক্রির একাধিক ধাপ। ফলে একটি চালান আটক হলেও পুরো নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকলে নতুন চালান নিয়ে আবারও তৎপর হয়ে উঠে সংশ্লিষ্ট চক্র।
স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে চোরাচালান ঘিরে প্রভাবশালী ব্যক্তি, পরিবহনসংশ্লিষ্ট লোকজন ও অসাধু চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসে। কোথাও চাঁদা আদায়ের অভিযোগও আলোচনায় আসে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিভিত্তিক অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সীমান্ত দিয়ে পণ্য কীভাবে প্রবেশ করছে, কোন পথে তা পরিবহন করা হচ্ছে, কারা এসব যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং কোথায় গিয়ে পণ্যগুলো মজুত বা বিক্রি হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা ছাড়া চোরাচালানের মূল শিকড় উপড়ে ফেলা কঠিন।
চোরাচালানের কারণে সরকার হারায় সম্ভাব্য শুল্ক ও কর রাজস্ব। অন্যদিকে বৈধভাবে আমদানি করা পণ্য বিক্রি করেন যেসব ব্যবসায়ী, তারাও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। শুল্ক-কর পরিশোধ না করে আনা পণ্য তুলনামূলক কম দামে বাজারে বিক্রি হলে বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
একই সঙ্গে মাদক চোরাচালান জনস্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অপরাধী চক্রের তৎপরতা বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই চোরাচালান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইতিমধ্যে তিন উপজেলায়ই হত্যার মতো ঘটনার জন্ম দিয়েছে।
তাই বিষয়টিকে কেবল সীমান্তে পণ্য আটক কিংবা কয়েকটি যানবাহন জব্দ করার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে অর্থনীতি, রাজস্ব, বৈধ ব্যবসা এবং জননিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত।
চোরাচালান প্রতিরোধে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ, কাস্টমস, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তে নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি চোরাচালানের কাজে ব্যবহৃত সড়ক, গুদাম ও পরিবহনব্যবস্থার ওপরও নজরদারি প্রয়োজন।
এ ছাড়া শুধু পণ্য বহনকারী চালক কিংবা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থেমে গেলে চলবে না। তদন্তের মাধ্যমে চালানের প্রকৃত মালিক, অর্থের জোগানদাতা, পরিবহন সমন্বয়কারী এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলে সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
অভিযানে জব্দ করা পণ্যের পরিমাণ, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ, মামলার অগ্রগতি এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালান বন্ধে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাও প্রয়োজন। সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার নিরাপদ ব্যবস্থা, নিয়মিত নজরদারি এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা গেলে প্রতিরোধব্যবস্থা আরও কার্যকর হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চোরাচালান বন্ধে নেওয়া পদক্ষেপের বাস্তব ফলাফল দৃশ্যমান হওয়া। সংবাদমাধ্যমে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে, জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি আসবে, অভিযানও চলবে—কিন্তু রাতের সড়কে অবৈধ পণ্যের বহর যদি আগের মতোই ছুটে চলে, তাহলে এসব উদ্যোগের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত চক্রকে আইনের আওতায় আনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা, পক্ষপাত কিংবা প্রভাবের অভিযোগ থাকলে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাটে চোরাচালান প্রতিরোধে তৎপরতা কি শুধু অভিযান, বক্তব্য আর হুঁশিয়ারিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সীমান্ত থেকে সড়ক পর্যন্ত সক্রিয় পুরো চক্রকে শনাক্ত করে অবৈধ পণ্যের প্রবাহ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে?