
নিজস্ব প্রতিবেদক:: সিলেট নগরী ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে সংঘটিত ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। দুই থেকে ছয় জনের একেকটি দল মোটরসাইকেলে এসে মুহূর্তের মধ্যেই মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ কিংবা মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনা ঘটছে একেবারে চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো দ্রুত ও পরিকল্পিত কৌশলে। এতে নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
বিশেষ করে নগরীর ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা এলাকাগুলোতেও এখন এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। সন্ধ্যার পর কিংবা রাতের দিকে চলাচলকারীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাইয়ের কৌশল এখন অনেকটা সংঘবদ্ধ রূপ নিয়েছে। সাধারণত দুই বা তিনজনের একটি দল মোটরসাইকেলে করে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে। এরপর হঠাৎ সামনে এসে পথরোধ করা, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া কিংবা ভয় দেখিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মোবাইল ফোন, টাকা বা ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে তারা। দ্রুত গতির মোটরসাইকেল ব্যবহার করায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা সহজেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।
এদিকে গত কয়েকদিনে আলোচিত একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত আসামিসহ প্রায় দুই শতাধিক চিহ্নিত ছিনতাইকারীকে আটক করেছে পুলিশ। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তবে পুলিশের এই অভিযানের মধ্যেও নতুন করে প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের ঘটনা সামনে আসায় উদ্বেগ কাটছে না নগরবাসীর।
একদিকে পুলিশের অভিযান ও গ্রেফতার, অন্যদিকে নতুন নতুন ছিনতাইয়ের ঘটনা—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে আতঙ্ক নিয়েই চলাফেরা করছেন সিলেটবাসী। বিশেষ করে রাতের সময় কিংবা ফাঁকা সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও বেড়েছে।
আইনজীবীরা বলছেন, বাংলাদেশের আইনে ছিনতাই একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাদ্দাম হোসেন জানান, দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৩৯০ অনুযায়ী বলপ্রয়োগ বা ভয় দেখিয়ে অন্যের সম্পদ নিয়ে নিলে সেটি ছিনতাই হিসেবে গণ্য হয়। আর ধারা ৩৯২ অনুযায়ী ছিনতাইয়ের অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে ছিনতাইয়ের সময় কেউ গুরুতর আহত হলে বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে ধারা ৩৯৪ ও ৩৯৫ অনুযায়ী আরও কঠোর শাস্তি, এমনকি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
তবে আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় শুধু কারাদণ্ড বা জরিমানা দিয়ে এই অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই সংঘবদ্ধ ছিনতাই দমনে অপরাধীদের অবৈধভাবে অর্জিত জমি, সম্পত্তি বা অন্যান্য সম্পদ ক্রোক করার মতো কঠোর আইনি বিধান যুক্ত করা প্রয়োজন।
গত সপ্তাহে সিলেট সফরকালে সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশনা দেন। আরিফুল হক চৌধুরী বলেন “ছিনতাইকারী বা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করলে যদি কেউ তদবির করতে আসে, তাহলে তাকেও ধরে নিয়ে আসবেন।”
এদিকে সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে সিলেট-১ আসেনের এমপি এবং বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমি আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিতে পারি, রাজনৈতিক কোনো অপ্রত্যাশিত চাপের কারণে আপনাদের কোনো কাজ যাতে বিঘ্ন না ঘটে, সেটার পুরোপুরি দায় দায়িত্ব আমাদের। সুতরাং আপনারা নিশ্চিন্তে কাজ করুন।”
তিনি আরও জানান, অপরাধ দমন ও নিরাপত্তা জোরদারে সিলেট নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও এলাকাগুলোতে আইপি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো যায়।
কঠোর আইন ও প্রযুক্তি নজরদারির দাবি
বিশ্লেষকদের মতে, মোটরসাইকেল ব্যবহার করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় অপরাধীরা এই কৌশল বেশি ব্যবহার করছে। কিছু ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যে ভাইরালও হয়েছে। তাই কঠোর আইনের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সিসিটিভি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, সন্দেহভাজন মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে অভিযান এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
সচেতন মহলের মতে, কঠোর আইন প্রয়োগ ও আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা গেলে সিলেটে বাড়তে থাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।