• ৯ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সৌন্দর্যে মোড়ানো আল-আমান বাহেলা মসজিদ

sylhetcrimereport
প্রকাশিত মার্চ ৮, ২০২৬
সৌন্দর্যে মোড়ানো আল-আমান বাহেলা মসজিদ

সংগৃহীত

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের হাফেজদের উজ্জ্বল পদচারণা। হিফজুল কুরআন চর্চায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে এক উজ্জ্বল উদাহরণ। আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতাগুলোতে প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশি হাফেজরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করছেন। তাদের মধুর তিলাওয়াত শুধু প্রতিযোগিতার মঞ্চেই নয়, বরং বিশ্বের নানা দেশের মসজিদে মুসল্লিদের হৃদয়েও গভীর ছাপ ফেলছে।

বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে তারাবির নামাজে ইমামতি করার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ পাচ্ছেন অসংখ্য বাংলাদেশি হাফেজ। তাদের সুমধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত বিদেশের মাটিতে রমজানের রাতগুলোকে করে তুলেছে আবেগঘন ও প্রশান্তিময়। যদিও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি হাফেজদের উপস্থিতি আগে তুলনামূলক কম ছিল, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের তিলাওয়াত মালয়েশিয়ার ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের হৃদয় জয় করতে শুরু করেছে।

কুয়ালালামপুরে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন বিশ্বজয়ী ক্বারি আবু রায়হান
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের কোতারায়া বাংলা মসজিদে তারাবির নামাজ পড়াচ্ছেন বিশ্বজয়ী কুরআন তিলাওয়াতকারী হাফেজ ক্বারি আবু রায়হান। তার সুমধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শুনে প্রবাসী বাংলাদেশি ও স্থানীয় মুসল্লিরা মুগ্ধ হয়ে যান।

২০০৫ সালে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার বল্লবদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব থেকেই কুরআনের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। নারায়ণগঞ্জের বল্লবদী আল-ইসলাহ একাডেমি ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসা থেকে তিনি কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করেন।

তার মেধা ও তিলাওয়াতের সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৮ সালে কাতারের টেলিভিশন চ্যানেল জিম টিভি আয়োজিত তিজান আন-নূর আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। এছাড়া ২০২৪ সালে আফ্রিকার সেনেগালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় ৩০টি দেশকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অধিকার করে আবারও বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে আনেন।

মালয়েশিয়ায় তারাবির নামাজে ইমামতি করার সুযোগ পেয়ে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল করাই তার স্বপ্ন।

এক দশক ধরে মালয়েশিয়ায় তারাবি পড়াচ্ছেন হাফেজ ইয়াসিন
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের ধন্ধি গ্রামের সন্তান হাফেজ মোহাম্মদ ইয়াসিন মালয়েশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জনতার সেবা করে যাচ্ছেন। তিনি সেলাঙ্গর রাজ্যের জেরাম কাম্পুং বুকিত চিরাকা তাহফিজ আর রোকাইয়া মাদরাসায় টানা ১০ বছর ধরে তারাবির নামাজ পড়াচ্ছেন।শুধু ইমামতিই নয়, তিনি সেখানে শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৭ সালের এপ্রিলে মালয়েশিয়ার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ওই মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবাসী কমিউনিটি নেতা রাশেদ বাদলের সহযোগিতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮২ সালে ঢাকার গেন্ডারিয়ার এম শফি উল্লাহ হাফিজিয়া মাদরাসা থেকে হিফজুল কুরআন সম্পন্ন করেন ইয়াসিন এবং প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তার সুমধুর তিলাওয়াত জেরাম কাম্পুং বুকিত চিরাকা তাহফিজ আর রোকাইয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মুসল্লিদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। বিদেশের মাটিতে কুরআনের খেদমত করার সুযোগ পেয়ে তিনি আনন্দিত। ভবিষ্যতেও যেন আরও বেশি মানুষের মাঝে কুরআনের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিতে পারেন সেজন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।

কুয়ালালামপুরে ইমামতি ও খতিবের দায়িত্বে ইকরামুল হক
হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ ইকরামুল হক কুয়ালালামপুরের তিতিওয়াংসা এলাকার সূরাও বায়তুল মোকাররামে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সেখানে একাধারে খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন এবং গত ১০ বছর ধরে তারাবির নামাজে ইমামতি করে আসছেন।

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থানার পোড়া ভিটা গ্রামের সন্তান ইকরামুল হক। তার বাবা মুহাম্মদ আবু হানিফ শেখ। তিনি ২০০৬ সালে আল জামিয়াতুল রাফজুল বাড়িয়া থেকে হিফজুল কুরআন সম্পন্ন করেন। পরে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করে ২০১৫ সালে সাভারের আল জামিয়াতুল মাদানিয়া রাজফুলবাড়িয়া থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন।

বিদেশের মাটিতে দীর্ঘদিন ধরে কুরআনের খেদমত করার সুযোগ পেয়ে তিনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, প্রবাসে দায়িত্ব পালন করা মানে শুধু ইমামতি করা নয়, বরং দেশের সুনামও বহন করা।

বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সম্মান উজ্জ্বল করার প্রত্যয়
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত এসব বাংলাদেশি হাফেজ তাদের তিলাওয়াত ও আচরণের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে চলেছেন। তাদের মধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শুনে মালয়েশিয়ার মুসল্লিরা যেমন মুগ্ধ হন, তেমনি বাংলাদেশ সম্পর্কেও ইতিবাচক ধারণা লাভ করেন।

এই হাফেজরা মনে করেন, কুরআনের খেদমতই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। বিদেশের মাটিতে দায়িত্ব পালন করে তারা যেন বাংলাদেশের সম্মান আরও উঁচুতে তুলে ধরতে পারেন এটাই তাদের প্রত্যাশা।পবিত্র কুরআনের সুমধুর তিলাওয়াতের মাধ্যমে তারা শুধু মসজিদের মুসল্লিদের হৃদয়ই স্পর্শ করছেন না, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কুরআনপ্রেমী জাতি হিসেবে পরিচয়ও তুলে ধরছেন। এজন্য তারা দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেছেন, যেন কুরআনের এই আলো আরও দূরে ছড়িয়ে দিতে পারেন।সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন আল-আমান বাহেলা খাতুন জামে মসজিদ। যা রূপ নিয়েছে যমুনাপাড়ের সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার ঐতিহ্যে। মসজিদটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন দূর-দূরান্তের মুসল্লি ও দর্শনার্থীরা। এটি সিরাজগঞ্জ-এনায়েতপুর সড়কের মুকন্দগাঁতী নামক স্থানে অবস্থিত। মসজিদটির আধুনিক নির্মাণশৈলী এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল নির্মাণ কৌশল আর দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যের কারণে এটি এখন কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; পরিণত হয়েছে পর্যটনকেন্দ্রে। দেশ-বিদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রতিদিন দেখতে আসে মসজিদের অপরূপ সৌন্দর্য। বিমোহিত হয় এর গঠন কাঠামো আর সবুজ প্রকৃতির ছোঁয়ায়।

জানা যায়, ২০২১ সালের ২ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হওয়া মসজিদটি গড়ে উঠেছে আড়াই বিঘা জমির ওপর। রহমত গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রয়াত শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী সরকার মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে টানা সাড়ে চার বছরের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা মসজিদে প্রতিদিন ৪৫ জন শ্রমিক নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন। নির্দিষ্ট কোনো স্থাপত্যবিদের ডিজাইনে নয়, মসজিদ নির্মাণে নিজস্ব পরিকল্পনাই ব্যবহার করেন শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী সরকার।

১১০ ফুট উঁচু মিনার ও ৩১ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা মসজিদের প্রতিটি দেওয়ালই যেন স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব নির্দশন। মিনার আর মসজিদের বিভিন্ন দেওয়ালে খচিত আছে আয়াতুল কুরসি, আর রহমানসহ পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সুরার আয়াত। ছোট ছোট গম্বুজ, মিনারের ভাঁজ, নামাজের জায়গায় থাকা সৌন্দর্য খচিত টাইলস, দেওয়ালে ব্যবহৃত রং-বেরঙের পাথর, সবমিলিয়ে পুরো মসজিদ কমপ্লেক্সটি যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা অপরূপ ছবি। আঞ্চলিক সড়কের পাশে থাকা মসজিদ কমপ্লেক্সে ঢুকলেই নাকে আসে ফুলের সুগন্ধ।

মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী সরকার তার ছেলে আল-আমান ও মা বাহেলা খাতুনের নামে ‘আল-আমান বাহেলা খাতুন জামে মসজিদ’ কমপ্লেক্স নামে ২০১৬ সালে নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০২০ সালের আগস্ট মাসে শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী সরকারের মৃত্যু হয়। পরে তার ছেলে আল-আমান মসজিদটির কাজ এগিয়ে নেন। নির্মিত মসজিদটির নির্মাণশৈলী এরই মধ্যে হাজারও মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে।

মসজিদটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান, মসজিদের ভেতরে একসঙ্গে সাত হাজার লোক নামাজ পড়তে পারেন। মুসল্লির সংখ্যা বেশি হলে ভেতর এবং আঙিনা মিলিয়ে নামাজ পড়তে পারেন প্রায় ১০ হাজার মুসল্লি। এতে ইতালি ও ভারত থেকে আনা উন্নতমানের মার্বেল পাথরসহ কাঠের কারুকাজে মসজিদের বিভিন্ন স্থানকে আকর্ষণীয় করতে নান্দনিক নকশার কাজ করা হয়েছে।

মসজিদের খাদেম আব্দুল মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মসজিদে ছাই রঙের বিশালাকৃতির মনোরম একটি গম্বুজ আছে। এ ছাড়া মেঝেতে সাদা রঙের ঝকঝকে টাইলস ও পিলারগুলো মার্বেল পাথরে জড়ানো। তৃতীয় তলায় গম্বুজের সঙ্গে লাগানো ছাড়াও অন্যান্য স্থানে চীন থেকে আনা বেশ কয়েকটি আলো ঝলমল ঝাড়বাতি আছে। এ ছাড়া দুপাশে নির্মাণাধীন ১১তলা সমতুল্য (১১০ ফুট) উচ্চতার মিনার থেকে আজানের ধ্বনি জমিনে ছড়িয়ে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘অনেক দূর থেকেই মসজিদের গম্বুজ ও মিনার দুটি সবার দৃষ্টি কাড়ে। এই মসজিদের চারপাশে সাদা রঙের পিলার, সুউচ্চ জানালা, সাদাটে রঙের টাইলস। মসজিদ চত্বরে পরিকল্পিতভাবে লাগানো সবুজ ঘাস। চারপাশে রং-বেরঙের লাইটিংয়ে রাতের বেলা অন্যরকম আবহের সৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে বেশ শান্ত পরিবেশ। এ কারণে সামনের সদা ব্যস্ত সড়কের কোলাহল যেন স্পর্শ করে না মসজিদটিকে।’

মসজিদ নির্মাণকালীন দেখভালের দায়িত্বে থাকা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ইমাম ও মুয়াজ্জিনের থাকার জন্য মসজিদের পাশে ১০তলা ভবনে নিজস্ব কোয়ার্টার, পাঠাগার ও শৌচাগার আছে। সেই সঙ্গে মুসল্লিদের কথা বিবেচনা করে মসজিদের প্রবেশপথের দুই সিঁড়ির পাশে একদম কাঁচে ঘেরা অটোফিল্টার করা পানি দিয়ে ওজুর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এটি নিছক উপাসনালয় নয়। দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে মসজিদের নির্মাণশৈলী বেশ আকর্ষণীয়। ব্যস্ত সড়কে যাতায়াতকারী যে কেউ প্রথম দেখাতেই থমকে দাঁড়ান। সব মিলে দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদ ঘিরে এ অঞ্চলে লোকজনের আনাগোনা বেড়েছে।’