• ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গ্রেফতারের পর নতুন করে আলোচনায় বেনজীরের যত অপকর্ম

sylhetcrimereport
প্রকাশিত জুন ১৫, ২০২৬
গ্রেফতারের পর নতুন করে আলোচনায় বেনজীরের যত অপকর্ম

সিকারি ডেস্ক:: ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতার হয়েছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দুবাই পুলিশ ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেফতার করে। রোববার এ তথ্য নিশ্চিত করেন পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এআইজি) শাহাদাত হোসেন।

এদিকে ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক এই পুলিশ প্রধানকে নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়ে যায়। ফেসবুক ওয়ালে জোয়ারের মতো ভাসতে থাকে ‘বেনজীরনামা’। ডাকসাইটে অতি স্মার্ট নামধারী এই পুলিশ কর্তার দুর্নীতির যেখানে যত সম্পদ, ক্রসফায়ার ও গুমের লোমহর্ষক নানা কাহিনিসহ অজস্র সব কালো অধ্যায়ের খবর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে এক রকম ঝড় শুরু হয়ে যায়। এর মধ্যে পরবর্তী করণীয় জানাতে গণমাধ্যমের সামনে আসে দুর্নীতি দমন কমিশন। জনসংযোগ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি নিয়ে তারাও কাজ শুরু করেছেন।

তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অনেকে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। যার সারমর্ম ছিল-খবরটি নিঃসন্দেহে আলোচিত এবং বহুল প্রত্যাশিত। যদিও অবিশ্বাস্য। তবে দেশে না আনা পর্যন্ত কেউ শতভাগ খুশি নন।

২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারের জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আদেশ দেন আদালত। ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন এ আদেশ দেন।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে বেনজীরের ‘দম্ভ চূর্ণ হয়েছে’ এখনই বলা যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, এটি একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। গ্রেফতারই চূড়ান্ত কিছু নয়। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহি আওতায় আনা গেলে তবেই বলা যাবে যে একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ জবাবদিহির আসল পরীক্ষা শুরু হবে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, তার গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে যে বার্তার কথা বলা হচ্ছে, সেটি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বার্তাটি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন প্রভাব-প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক সংযোগ কিংবা ক্ষমতার অবস্থান নির্বিশেষে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে এবং বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

তার ভাষায়, এ ঘটনা আপাতত এটুকুই দেখাচ্ছে যে সরকারের সদিচ্ছা, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকলে বিদেশে অবস্থানকারী অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরও দেশে ফিরিয়ে এনে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব। তবে চূড়ান্ত বার্তা পাওয়ার জন্য পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা। আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রেফতারের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন বা প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা, তদন্ত প্রতিবেদন ও আইনি নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রেফতার হওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা। কারণ প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় সমন্বয় এবং আদালতসংশ্লিষ্ট নানা ধাপ রয়েছে। তবে সরকার এটিকে একটি বড় সাফল্য হিসাবে দেখছে।

সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এই গ্রেফতার প্রমাণ করেছে অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পদে থাকা একজন সাবেক কর্মকর্তার বিদেশে গ্রেফতার এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এখন দেশের বিচার ও জবাবদিহির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এ তথ্য জানান সংস্থাটির উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম।

তিনি বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে দুদকের ছয়টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় ইতোমধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং সেই মামলার বিচার চলছে। বাকি পাঁচটি মামলার তদন্ত চলমান। এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রায় ৭৬ কোটি টাকার জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, এসব মামলার মধ্যে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়ের হওয়া দুটি মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। সেই নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতেই দুবাইয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় তাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বেনজীরের বিরুদ্ধে দুদকের যত মামলা: ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর পৃথক চারটি মামলা করে দুদক। ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীতে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও আরেকটি মামলা করে দুদক।

যত সম্পদ জব্দ: আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৪ সালের এপ্রিলে তার ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের অনুসন্ধানে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুসন্ধান শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই পরিবার নিয়ে দেশ ছাড়েন তিনি। এরপর আর দেশে ফেরেননি। দুদকের অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসে। আদালতের আদেশে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা শত শত বিঘা জমি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, শেয়ার এবং অন্যান্য সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ১২ জুন বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা ৮টি ফ্ল্যাট এবং ২৫ একর (১ একর সমান ৬০ দশমিক ৫ কাঠা) ২৭ কাঠা জমি জব্দ করার (ক্রোক) আদেশ দেন আদালত। এসব ফ্ল্যাট ঢাকার বাড্ডা ও আদাবরে এবং জমি নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবান ও উত্তরায়। এ ছাড়া দুই দফায় বেনজীর ও তার পরিবারের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। এ ছাড়া ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং ৩টি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন আদালত।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: বেনজীর আহমেদ র‌্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে র‌্যাবের অভিযানে নিখোঁজ ও নিহত হওয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরে ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় তার নামও অন্তর্ভুক্ত হয়।

কৌশলে দেশ ছাড়েন বেনজীর: দুদকের অনুসন্ধান শুরুর দুই সপ্তাহের মাথায় ২০২৪ সালের ৪ মে দেশ ছাড়েন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। দুবাইয়ে তার গ্রেফতারের খবর সামনে আসার পর আবারও আলোচনায় এসেছে সেই বহুল আলোচিত দেশত্যাগের ঘটনা। যে ভিডিও এখন ভাইরাল কনটেন্ট।

ওইদিন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সহায়তায় তিনি বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। রাত ১১টা ৪০ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করেন তিনি।

ফুটেজে দেখা যায়, নিরাপত্তা তল্লাশি এলাকায় প্রবেশের সময় তার সামনে ছিলেন ইউনিফর্ম পরা এক পুলিশ সদস্য ও সাদা পোশাকের এক নারী পুলিশ সদস্য। পেছনেও ছিলেন আরেক ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্য। দেশ ছাড়ার সময় তার সঙ্গে পরিবারের অন্য কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। সোনালি রঙের হাফশার্ট, গাঢ় রঙের প্যান্ট ও কালো জুতা পরা অবস্থায় তিনি বিমানবন্দরের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করেন।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয় শেষ নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকিতে। ফুটেজে দেখা যায়, সেখানে দায়িত্বরত আনসার সদস্যের শারীরিক তল্লাশি ছাড়াই তিনি চেকপয়েন্ট অতিক্রম করেন। অথচ সাধারণ যাত্রীদের ক্ষেত্রে এই তল্লাশি বাধ্যতামূলক। এছাড়া ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতাও দ্রুত সম্পন্ন করা হয় বলে ফুটেজে দেখা যায়।

দেশ ছাড়ার আগে বিমানবন্দরে উপস্থিত কয়েকজন পুলিশ সদস্যের দিকে হাত নেড়ে বিদায় জানাতেও দেখা যায় বেনজীর আহমেদকে। দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় তার এই দেশত্যাগ পরবর্তীকালে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, সম্পদ জব্দ এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও তিনি আর দেশে ফেরেননি। এখন দুবাইয়ে গ্রেফতারের পর সেই দেশত্যাগের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।