• ৯ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

প্রকাশনা শিল্পে নারীর পদচারণা

sylhetcrimereport
প্রকাশিত মার্চ ৮, ২০২৬
প্রকাশনা শিল্পে নারীর পদচারণা

আজ ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। বিশ্বায়নের এই যুগে সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাঙালি নারীরা নিজের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছেন। শিক্ষা, প্রশাসন, গণমাধ্যম কিংবা সংস্কৃতির পাশাপাশি দেশের প্রকাশনা শিল্পেও নারীরা তৈরি করেছেন নিজেদের শক্ত অবস্থান। এরই প্রাণবন্ত প্রতিফলন দেখা যায় অমর একুশে বইমেলার প্রাঙ্গণে।

বইমেলায় ঘুরে দেখা যায়, বহু প্রকাশনা সংস্থার নেতৃত্বে রয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। কেউ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এই শিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ নতুন ধারণা ও উদ্যোগ নিয়ে যোগ করেছেন নতুন মাত্রা।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও গবেষকদের মতে, প্রকাশনায় নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও পাঠ সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করছে। বিশেষ করে শিশুসাহিত্য, অনুবাদ ও গবেষণাধর্মী বই প্রকাশে অনেক নারী প্রকাশক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের মতে; ব্যবস্থাপনা, সম্পাদনা, নকশা ও বিপণন- সব ক্ষেত্রেই নারীরা দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের নারী উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক প্রকাশনার ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসায় ভবিষ্যতে এই শিল্পে তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে বলেও মনে করছেন তারা।

এবার বইমেলায় অংশ নেওয়া নারী প্রকাশকদের মধ্যে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) দায়িত্বে আছেন মাহরুখ মহিউদ্দিন। এ ছাড়া শাহীনা আক্তারের বর্ণবই, লিলি হকের চয়ন প্রকাশনী, জোবায়দা গুলশান আরা হেনার পিপিএমসি, সাজেদা হেলেনের নব আলো, সুস্মিতার চিলড্রেন বুক কালেকশন, গুলশান আরা বাবলীর অন্বয় প্রকাশ, নাজমা আক্তারের চিলড্রেন স্টার, শামীমা শাহীনের চন্দ্রদীপ, রুমানা শারমীনের দ্য পপ-আপ, নাহরীন জান্নাতের চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনী, শাহনাজ পারভীনের বইবাংলা, নিলুফা ইয়াসমীনের সাত ভাই চম্পা, রীনা রানী রায়ের মা প্রকাশনী ও শিখা সরকারের সপ্তবর্ণ মেলায় নিয়মিত অংশ নিচ্ছে।

এ তালিকায় আরও আছেন বই উদ্যানের কর্ণধার শেখ জান্নাতুন নিসা, সৌম্য প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী জেবুন্নেছা জেবু এবং হুল্লোড় প্রকাশনার প্রতিষ্ঠাতা মনোয়ারা সুলতানা। ফাতেমা তুজ জোহরার জলপরী, মাহবুবা লাকির চিরদিন প্রকাশনী, বিপাশার মাটিগন্ধা, রেইনি দিল আফরোজ নাসরীনের মা ও শিশু, কাব্য সুলতানার ঊষার দুয়ার, রমা রানী পালের শিশু গ্রন্থকুটির, নাহিদা আশরাফীর জলধি, শায়লা রহমান তিথির ঝুমঝুমি প্রকাশন, শরিফা বুলবুলের বলাকা প্রকাশন এবং তিসমার ময়ূরপঙ্খীও নারী নেতৃত্বে পরিচালিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বইমেলায় উপস্থিত রয়েছে।

ময়ূরপঙ্খীর তিসমা জানান, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বইমেলায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি প্রকাশনা বিষয়ে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। প্রতি বছরই নতুন ধারণা ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনায় শিশুদের জন্য বই নিয়ে মেলায় হাজির হন তিনি।

বলাকা প্রকাশনের শরীফা বুলবুল বলেন, ২০০৫ সাল থেকে তিনি নিয়মিত বইমেলায় অংশ নিচ্ছেন।

চয়ন প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী লিলি হক বলেন, প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। আর্থিক লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি নিয়মিত মেলায় অংশ নেন। তার ভাষায়, বইমেলায় এলে তিনি এক ধরনের প্রাণের পরশ পান।

অন্যদিকে জলপরী প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী সাফিয়া খন্দকার রেখা জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি লেখালেখি করছেন, বিশেষ করে শিশুসাহিত্য নিয়ে। ২০১৬ সাল থেকে প্রকাশনায় সক্রিয় এবং ২০২০ সাল থেকে মেলায় নিয়মিত স্টল নিচ্ছেন। তবে প্রতি বছর নানা বিতর্ক ও অনিয়মের বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, বইমেলাকে প্রকৃত অর্থে প্রকাশকদের মেলা হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি, তা না হলে এই শিল্পে পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে বইমেলার প্রাঙ্গণে নারীদের এই সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণ করে, বাঙালি নারীরা আজ প্রকাশনা শিল্পেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছেন। তাদের হাত ধরে বাংলা বইয়ের জগৎ আরও সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে।

এদিকে গতকাল বইমেলার দ্বিতীয় শনিবার ও চতুর্থ শিশু প্রহরে ছিল শিশু-কিশোর ও অভিভাবকদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি। সকাল থেকে রঙিন গল্প, ছড়া ও ছবির বই ঘিরে ছিল তাদের আগ্রহ। দিনভর পাঠকের ভিড়ে অনেক স্টলে বই বিক্রি তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক হয়েছে বলে জানান প্রকাশকরা।

গতকাল দশম দিন মেলা চলে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত ছিল শিশুপ্রহর।

নতুন বই : গতকাল এক দিনে নতুন বই এসেছে ১৮৫টি। গত ৯ দিনে মোট নতুন বই এসেছে ৭৫৮টি।

শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা : বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

মূল মঞ্চের আয়োজন : বিকাল ৩টায় অনুষ্ঠিত হয় ‘জন্মশতবর্ষ : নূরজাহান বেগম’ শীর্ষক আলোচনা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসরাইল খান। আলোচনায় অংশ নেন সোহরাব হাসান। সভাপতিত্ব করেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। ইসরাইল খান বলেন, সাপ্তাহিক ‘বেগম’র তুলনা নেই। সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে এই পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সম্পাদক হিসেবে নূরজাহান বেগমের নামও সমমর্যাদায় উচ্চারিত হবে।

সোহরাব হাসান বলেন, ‘বেগম’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল; পরে নূরজাহান বেগম দায়িত্ব নেন। তিনি মেধা ও উদ্যোগে পত্রিকার মাধ্যমে নারী জাগরণ এগিয়ে নেন এবং নারী লেখক-শিল্পীদের নিয়ে ‘বেগম ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেন।

লেখক বলছি : নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন মুস্তাফা মজিদ।

সাংস্কৃতিক আয়োজন : কবিতা পাঠ করেন মিনহাজুল হক। আবৃত্তি পরিবেশন করেন সাহিদা পারভীন রেখা, আনজুমান আরা এবং আজহারুল ইসলাম রনি। সংগীত পরিবেশন করেন ফেরদৌস আরা, পিয়াল হাসান, নিশাত আহমেদ, মো. ইউসুফ আহমেদ খান, জয় শাহরিয়ার, নির্ঝর চৌধুরী এবং মো. শফিউদ্দিন।

আজকের আয়োজন : আজ মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘আসাদ চৌধুরী’ শীর্ষক আলোচনা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কুদরত-ই-হুদা। আলোচনায় অংশ নেবেন সৈকত হাবিব। সভাপতিত্ব করবেন সৈয়দ আজিজুল হক। বিকাল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।