
আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতিবছরের মতো এবারও দিনটি নানা কর্মসূচি, আলোচনা ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে পালিত হবে। তবে নারী দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি নারীর অধিকার, সমতা ও মর্যাদার দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস স্মরণ করারও একটি উপলক্ষ। একই সঙ্গে এটি বর্তমান বাস্তবতা পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন অঙ্গীকার করার সময়।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ইতিহাস মূলত শ্রমজীবী নারীদের অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপ ও আমেরিকায় বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক কারখানায় কাজ করতে শুরু করেন। কিন্তু কর্মঘণ্টা দীর্ঘ, মজুরি কম এবং কাজের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত কঠিন। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকেই নারী দিবসের ধারণার সূচনা।
১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নারী শ্রমিকরা কম কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি এবং ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন করেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। পরবর্তী সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে নারী দিবস পালন শুরু হয়। পরে জাতিসংঘ ১৯৭৫ সাল থেকে ৮ মার্চকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেই থেকে দিনটি বিশ্বব্যাপী নারী অধিকার ও সমতার প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নারী দিবসের মূল চেতনা হলো অধিকার, ন্যায়বিচার ও সমতার সংগ্রাম। আজকের পৃথিবীতে নারীর অবস্থানে অনেক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশেও গত কয়েক দশকে নারীর অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতিও আগের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে নারীরা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। অনেক নারী উদ্যোক্তা নতুন উদ্যোগ নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসন, রাজনীতি ও বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রেও নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি বাড়ছে। এসব অর্জন সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি ও নিরাপদ পরিবেশ এখনও সব জায়গায় নিশ্চিত নয়। অনেক নারী পরিবার ও পেশাগত জীবনের দ্বৈত দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে বাড়তি চাপের মুখে পড়েন। গ্রামীণ এলাকায় বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং অনেক মেয়ে এখনও উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
নারীর প্রতি সহিংসতা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকজনিত সহিংসতা কিংবা অনলাইন হয়রানির মতো ঘটনা সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। আইন থাকলেও অনেক সময় তার যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায় না। ফলে অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতায় নারী দিবস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে- কীভাবে সমতাভিত্তিক ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা যায়। এর জন্য প্রথমত প্রয়োজন শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়ন। শিক্ষিত নারী কেবল নিজের জীবন নয়, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও বদলে দিতে পারেন। তাই মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়া কমানো অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়াতে হবে। উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা বাড়ানো গেলে তারা আরও সক্রিয়ভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা, নারী অধিকার কেবল নারীদের বিষয় নয়; এটি সমগ্র সমাজের অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং রাষ্ট্র- সব ক্ষেত্রেই সমতার দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পুরুষদেরও এই পরিবর্তনের অংশ হতে হবে।